কাঁচাপাকা সোনালি চুল, কানে স্বর্ণের দুল আর লাল পোশাক পরে রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন নাটালি হার্প। সেটি ছিল ২০২০ সালের ঘটনা। ওই অনুষ্ঠানে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন একরাশ প্রশংসার বাণীতে।
সম্মেলনে ট্রাম্পকে ‘ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ (১৯৪৬)’ সিনেমার চরিত্র জর্জ বেইলির সঙ্গে তুলনা করেন হার্প। সিনেমার একটি সংলাপের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আপনি শুধু তাই সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবেন, যা আপনি অন্যদের বিলিয়ে দিয়েছেন। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, সে হিসেবে আপনি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ।’
ছয় বছর পর, হার্প এখন ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকারী। তাঁর সরকারি পদবি প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী। বার্ষিক বেতন দেড় লাখ ডলার (প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা)। তবে অনেকে তাঁকে ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ বলেন। বিভিন্ন তথ্য ও খবর প্রিন্ট করে ট্রাম্পকে দেওয়াটাই তাঁর মূল কাজ।
এতদিন ট্রাম্পের ‘সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স’ বা বলয়ে গৌণ চরিত্র হিসেবে থাকলেও হার্প সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। তাঁকে আলোচনায় এনেছেন ডেমোক্রেটিক সিনেটর ও ২০২৮ সালের নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন ওসফ। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প নিজের কাজ করার বদলে বলরুম তৈরি ও নাটালিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেই বেশি আগ্রহী।
ওসফের এই মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প-হার্পের সম্পর্ক ঘিরে জল্পনা-কল্পনার ঢেউ তুলেছে। সম্প্রতি সিএনএনের এক সাংবাদিক বিষয়টি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলে ট্রাম্প ক্ষেপে যান। হোয়াইট হাউসও আগুন নেভানোর বদলে তাতে যেন ঘি ঢালে। তারা সিএনএনের সাংবাদিককে নিয়ে কড়া মন্তব্যের পাশাপাশি ডেমোক্রেট সিনেটর ওসফের জাতীয় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই উত্তেজনার মধ্যে সাধারণ নাগরিকরাও এখন ট্রাম্প ও হার্পকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
কে এই নাটালি হার্প?
৩৫ বছর বয়সী হার্প ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা। ২০১২ সালে তিনি সান ডিয়াগোর ‘পয়েন্ট লোমা নাজোরিন ইউনিভার্সিটি’ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৫ সালে ভার্জিনিয়ার লিবার্টি ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই খ্রিস্টানদের আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
এক সময় বোন বা হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন হার্প। ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন তখন নিজের সুস্থ হওয়ার পেছনে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের স্বাস্থ্যনীতির কৃতিত্ব দেন হার্প। বলেন, ডেমোক্রেটদের সময় ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ‘রাইট টু ট্রাই অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেন। ওই নীতির কারণে তিনি এমন কিছু গবেষণাধীন ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ পান যা তাঁর জীবন বাঁচিয়েছে।
২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় লিংকডইনে একটি পোস্টে হার্প লিখেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা দলটি ট্রাম্পের। আমি এর জীবন্ত প্রমাণ।’ হার্পের এই পোস্ট নজরে পড়ে রক্ষণশীল গণমাধ্যম ফক্স নিউজের। একটি অনুষ্ঠানে আলোচনার জন্য তারা হার্পকে আমন্ত্রণ জানায়। পরে ওই অনুষ্ঠান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেন। একইসঙ্গে নিজের স্বাস্থ্যনীতির প্রচার চালান।
মূলত, ফক্স নিউজের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমবার ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নাটালি। পরে তাঁকে রিপাবলিকান পার্টির ২০২০ সালের জাতীয় সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওই সম্মেলনে দলটি সে বছরের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে।
ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে হেরে যান। ২০২২ সালে তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করেন হার্প। তখন কোনো পদবি ছিল না। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় হার্পকে প্রায়ই একটি প্রিন্টার ও ব্যাটারি হাতে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা যেত। এর মাধ্যমে তিনি তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রিন্ট কপি ট্রাম্পকে দিতেন। তখন থেকে পরিচিতি পান ‘হিউম্যান প্রিন্টার’ নামে। এই নির্বাচনে জেতার পর হার্পকে বিশেষ সহকারী বানিয়েছেন ট্রাম্প।