ভূপ্রকৃতি আর মানচিত্রের গঠন একেকটি দেশকে দিয়েছে একেক রূপ। অন্যদিকে ধর্ম, বর্ণ, জাত-গোত্র সব মিলিয়ে হরেক মানুষের বসবাস পৃথিবীতে। তাই ব্যস্ততার ফাঁকে যখনই এক চিলতে অবসর মেলে, ছুটে যাই দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে। আমার অনুসন্ধানী মন পরিচিত হতে চায় স্থানীয়দের ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে। তাদের যাপিত জীবনের চিত্রটা কেমন, তা মনের পর্দায় ছবির মতো এঁকে নিতে চায়।
একই সঙ্গে তাদের খাবারদাবারের বিষয়ে দারুণ কৌতূহল কাজ করে। তাই আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু সুন্দর জায়গায় গিয়ে ছবি তোলা নয়; সেই জায়গার মানুষ, তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি আর স্থানীয় খাবারের মধ্যে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
আমি পাহাড় আর সমুদ্র দুটোই ভীষণ ভালোবাসি। সমুদ্রের পাশে বসে চুপচাপ ঢেউয়ের শব্দ শুনে যাওয়া মুহূর্তে মনটা অন্য রকম এক প্রশান্তিতে ছেয়ে যায়। সে কারণে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যখন ঘর ছেড়ে বের হওয়ার পরিকল্পনা করি, তখন গন্তব্য হিসেবে সবার আগে উঠে আসে স্বেতহস্তীর দেশ থাইল্যান্ডের নাম। কো ফি ফি আর ক্রাবির মতো জায়গা যতবার ঘুরে এসেছি, বারবার মনে হয়েছে আবার সেখানে যেতে হবে।
শুধু তাই নয়, থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই, চিয়াং রাই, মায় হং সন লুপ, কো লান্টা, ফুকেট, সামোয়েং লুপ থেকে শুরু করে যত দর্শনীয় স্থান আছে, তা যেন ক্ষণে ক্ষণে ছাতছানি দিয়ে ডাকে। কানে কানে যেন মৃদুস্বরে বলে যায়, ‘যাচ্ছো যাও, আবার কিন্তু এখানে ফিরে আসতে হবে।’
থাইল্যান্ড কেন আমাকে বারবার হাতছানি দেয়? নিজেকে সে প্রশ্ন বহুবার করেছি। উত্তরটাও নিজের মন থেকে উঠে এসেছে, তা হলো– অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কো ফি ফি’র কথাই বলি, নির্জন সাদা বালুর সৈকতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চুনাপাথরের পাহাড়ের দিকে যখন দৃষ্টি যায়, সময় কীভাবে কেটে যায়, তার হিসাব মেলানো কঠিন। এতটাই মনোমুগ্ধকর সেই স্থান। নৌকায় করে দ্বীপপুঞ্জটি ঘুরে দেখার মাঝে পাওয়া যায় রোমাঞ্চের স্বাদ।
পর্যটনকেন্দ্র মায়া বে, মানকি বিচ ও ফি ফি ডনের কথাও আলাদাভাবে বলা যায়। ফি ফি’র মতো ক্রাবির সৌন্দর্যের বর্ণনা করাও কঠিন। কারণ এ কেবল মুগ্ধ হয়ে দেখার, অনুভব বদলে দেওয়ার– যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ক্রাবির অন্যতম আকর্ষণ রেইলে সমুদ্রসৈকত। ক্রাবি থেকে এই সৈকতে নৌকায় চড়ে যেতে সময় লাগে মাত্রা ২০ মিনিট। এখানে গুহা অভিযান, চুনাপাথরের পাহাড়ে চড়ার পাশাপাশি এক হাজার ২৬০ ধাপের সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখা যায় ওয়াট থাম সুয়া মন্দির, যা পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
ভ্রমণে আমার সঙ্গে কোনো না কোনো খাবার থাকবেই। থাইল্যান্ড স্ট্রিট ফুডের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ম্যাঙ্গে স্টিকি রাইস। এক কথায় আমার কাছে বেহেশতি একটি খাবার। আর কেনাকাটার বিষয়ে যদি বলি, তাহলে নিঃসংকোচে স্বীকার করতেই হবে অন্য মেয়েদের মতো আমারও শপিংয়ের প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। পশ্চিমা হালফ্যাশনের পোশাক আর প্রিয় ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটার জন্য থাইল্যান্ডের প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ আছে।
মজার বিষয় হলো, ভ্রমণে কখন কী অভিজ্ঞতা হবে, আগে থেকে বলা যায় না। যেমন ফুকেটের বাংলা স্ট্রিটে এক ভারতীয় জ্যোতিষীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি আমার সম্পর্কে এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যেগুলো পরে অবিশ্বাস্যভাবে মিলে গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎটা আমার স্মৃতিতে অম্লান। এমন অনেক কারণে আমি ভ্রমণ করতে এত ভালোবাসি। প্রতিটি যাত্রা আমাকে একটি নতুন গল্প আর নতুন অভিজ্ঞতা উপহার দেয়।
লেখক: শ্রাবণ্য তৌহিদা, উপস্থাপক