বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ২০২৬-২০২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন দাখিলের কার্যক্রম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ২২ জুলাই থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন সেবা চালু করেছে। এবার বছরের বিভিন্ন সময়ে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকলেও ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ওপর ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর প্রণোদনা পাওয়া যাবে।
রিটার্ন দেওয়ার সময় শুধু আয়ের অঙ্ক উল্লেখ করলেই হয় না। কোন খাত থেকে কত আয় হয়েছে, তার পক্ষে প্রয়োজনীয় হিসাব, সনদ বা নথি হাতে রাখা জরুরি। আয়কর আইন অনুযায়ী ব্যক্তির আয় সাতটি প্রধান খাতে ভাগ করা হয়েছে।
চাকরিজীবীদের রিটার্নে বেতন, ভাতা ও অন্যান্য প্রযোজ্য আয় সঠিকভাবে দেখাতে হয়। এ ক্ষেত্রে বেতনসংক্রান্ত নথি প্রস্তুত রাখা ভালো। যেমন- বেতন বিবরণী বা স্যালারি স্টেটমেন্ট, পে-স্লিপ, নিয়োগকর্তার কাছ থেকে পাওয়া বেতন ও কর কর্তনের সনদ, উৎসে আয়কর কর্তনের প্রমাণপত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বোনাস বা অন্যান্য ভাতার বিবরণ। এনবিআরের রিটার্ন ফরমের নির্দেশনাতেও বেতনের আয়ের ক্ষেত্রে স্যালারি স্টেটমেন্ট সংযুক্তির কথা বলা হয়েছে।
বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অন্য কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে আয় থাকলে সেই আয়ের পক্ষে চুক্তি ও লেনদেনের প্রমাণ রাখা দরকার। যেমন- ভাড়ার চুক্তিপত্র, ভাড়া গ্রহণের রসিদ, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী বা লেনদেনের প্রমাণ, সম্পত্তির মালিকানার দলিল, পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের রসিদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাড়ির ঋণের সুদ ও অন্যান্য অনুমোদিত ব্যয়ের নথি
কৃষিজমি, ফসল, মাছ বা অন্যান্য কৃষিকাজ থেকে আয় থাকলে সেই আয়ের হিসাবের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথি রাখা উচিত। যেমন-জমির মালিকানা বা লিজের কাগজ, কৃষিপণ্য বিক্রির রসিদ বা চালান, কৃষিকাজে করা ব্যয়ের হিসাব
পণ্য বিক্রির ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ, যদি থাকে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের হিসাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি আলাদা হতে পারে। সাধারণভাবে প্রস্তুত রাখুন-আয়-ব্যয়ের হিসাব, ক্যাশবুক, লেজার, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজ, বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব, ইনভয়েস ও ভাউচার, স্টক বা মজুতের হিসাব
জমি, ফ্ল্যাট, শেয়ার বা অন্য কোনো মূলধনি সম্পদ বিক্রি করে লাভ হলে সেটি রিটার্নে দেখাতে হতে পারে। এক্ষেত্রে-সম্পদ কেনার দলিল, বিক্রয় দলিল, নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি, ক্রয়-বিক্রয়ের অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন বা অন্যান্য খরচের নথি সংরক্ষণ করা উচিত। এনবিআরের রিটার্ন নির্দেশনাতেও ক্যাপিটাল গেইনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি রাখার কথা উল্লেখ আছে।
ব্যাংক আমানত, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা অন্যান্য আর্থিক সম্পদ থেকে আয় হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া বিবরণী ও সনদ কাজে লাগবে। যেমন- ব্যাংকের সুদ বা মুনাফার সনদ, এফডিআর সনদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার বিবরণী, লভ্যাংশের সনদ বা বিবরণী, শেয়ার বা বিও হিসাবের স্টেটমেন্ট, মিউচুয়াল ফান্ডের বিবরণী
উপরের খাতগুলোর বাইরে কমিশন, সম্মানী, পরামর্শ ফি, পুরস্কারের অর্থসহ অন্যান্য আয় থাকলে সেই আয়ের উৎস অনুযায়ী প্রমাণপত্র রাখতে হবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেমেন্ট রসিদ, চুক্তিপত্র বা আয় প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু আয়সংক্রান্ত কাগজপত্র নয়, রিটার্ন পূরণের সময় নিজের ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, প্রভিডেন্ট ফান্ড, জীবনবিমার প্রিমিয়াম, দান বা কর রেয়াত-সংক্রান্ত নথিও প্রয়োজন হতে পারে। এনবিআরের রিটার্ন ফরমের নির্দেশনায় বিনিয়োগ, সঞ্চয়পত্র, জীবনবিমা, ডিপিএস, শেয়ারসহ বিভিন্ন দাবির পক্ষে নথি রাখার কথা বলা হয়েছে। অনলাইনে রিটার্ন দিলেও এসব নথি নিজের কাছে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতে আয় বা বিনিয়োগের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখাতে হতে পারে। তাই রিটার্নে কোনো আয় বা ব্যয়ের তথ্য অনুমান করে না বসিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি মিলিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া উচিত।