ঢাকা | সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
     ইরানকে ‘আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা’ ওড়ানোর আহ্বান ট্রাম্পের      বিলুপ্ত হচ্ছে র‍্যাব, আইনের খসড়া অনুমোদন      সুন্দরবন ভ্রমণে যৌন নিপীড়নের শিকার জাবির নারী শিক্ষার্থীরা      ডারউইনে বাংলাদেশের জয় নিয়ে যা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম      প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের পর গ্যাস-বিদ্যুতের পরিকল্পনা দিল বিরোধী দল      গ্রিন ইয়ার্ডের বিষাক্ত গ্যাসে থমকে আছে তদন্ত      ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে এক মন্তব্য করে দীর্ঘদিন ভুগেছেন ইমরান      ড. নাসিমুল গনিকে আরও এক বছরের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ      শিক্ষকদের বদলি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ জানাল মাউশি      উপসচিব হলেন ২৭৭ কর্মকর্তা      বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা নীতি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: শিক্ষামন্ত্রী      ইরানকে সাদা পতাকা তোলার আহ্বান ট্রাম্পের, ওমানে হামলার হুমকি      নারীদের জন্য চালু হচ্ছে বিশেষ বাস      যৌন হয়রানি ও প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে রাবি অধ্যাপকের চাকরিচ্যুতি      পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মন্ত্রীর আত্মহত্যা

ডারউইনে বাংলাদেশের জয় নিয়ে যা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

ডারউইনে বাংলাদেশের জয় নিয়ে যা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম
জনতার কথা বলে।
Daily Barta Post
সংগৃহীত ছবি

নিজেদের মাটিতে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটের পরাজয় যেন মেনে নিতে পারছে না অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম। ডারউইন টেস্টে স্বাগতিকদের এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে তীব্র সমালোচনা। কোথাও ম্যাচটিকে বলা হয়েছে ‘অস্বস্তিকর হার’, কোথাও ‘ডারউইন বিপর্যয়’, আবার কোথাও অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্সকে বলা হয়েছে ‘দেখার মতোই বাজে’। আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকেরা প্রশংসায় ভাসিয়েছেন বাংলাদেশকে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হারকে ‘গবস্ম্যাকিং শ্যাম্বলস’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতি, যা একই সঙ্গে বিস্ময়কর ও চরম বিশৃঙ্খল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরাজয়কে সাধারণ কোনো হার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিব্রতকর পরাজয়গুলোর একটি।

রবার্ট ক্র্যাডকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটের হার অস্ট্রেলিয়ার ১২ মাসে ২০ টেস্ট খেলার দীর্ঘ অভিযানের শুরুতেই বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। ঘরের মাঠে ক্যামেরন গ্রিনের কাঙ্ক্ষিত প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়ার পরাজয় কিছুটা বিলম্বিত করলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারেনি।

মারারা স্টেডিয়ামের উইকেটেরও প্রশংসা করেছে দ্য অস্ট্রেলিয়ান। তাদের মতে, পুরো ম্যাচেই পিচ ছিল দারুণ। অথচ ম্যাচের শুরুতে দুই দলের শক্তির ব্যবধান এতটাই বড় মনে হচ্ছিল যে এটি একতরফা লড়াই হতে পারে বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়া সর্বশেষ দুটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলেছে এবং নিজেদের আগের ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জয় পেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, যারা এশিয়ার বাইরে নিয়মিত সংগ্রাম করেছে এবং নিজেদের সর্বশেষ ২৬ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগেও জিম্বাবুয়ে ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই দলই ডারউইনে বদলে দিয়েছে পুরো চিত্র। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে যোগ করেছে স্মরণীয় এক অধ্যায়।

দ্য ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়ান-এর জশ কেম্পটন অস্ট্রেলিয়াকে ‘আদর্শ অর্থেই অসহায় সফরকারী দল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের কাছে এই হারকে তিনি বলেছেন ‘অস্বস্তিকর পরাজয়’।

অস্ট্রেলিয়ার প্রভাবশালী সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এর সমালোচনাও ছিল তীব্র। একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘নিজেদের ভুল না করা দলের কাছে টেস্ট ব্যাটিংয়ের শিক্ষা পেল অস্ট্রেলিয়া’। আরেক প্রতিবেদনে ডারউইনের হারকে সরাসরি ‘ডারউইন বিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে অস্ট্রেলিয়া দলের জন্য এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে নর্দার্ন টেরিটরি নিউজ-এ। তাদের খেলোয়াড়দের রেটিংয়ের শিরোনাম ছিল ‘দেখার মতোই বাজে’। অভিজ্ঞ ক্রিকেট লেখক রবার্ট ক্র্যাডক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কেন এটি অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বাজে টেস্ট হার?’

প্রিন্ট সংস্করণেও হারের তীব্রতা স্পষ্ট করেছে পত্রিকাটি। প্রথম পাতাজুড়ে শিরোনাম, ‘ডারউইন বিপর্যয়: অস্ট্রেলিয়াকে ছিন্নভিন্ন করল বাংলাদেশ’। সঙ্গে ছিল বাংলাদেশের সমর্থকদের জয় উদ্‌যাপনের ছবি।

স্পোর্টস পাতায় বাংলাদেশের জয়কে তুলে ধরা হয়েছে ‘বেঙ্গাররা নিজেদের ইতিহাস লিখল’ শিরোনামে। আর শেষ পাতায় শব্দের খেলায় শিরোনাম করা হয়েছে ‘অস্ট্রেলিয়া বেধড়ক পিটুনি খেল!’

অস্ট্রেলিয়ার আরেক সংবাদমাধ্যম হেরাল্ড সান শিরোনাম করেছে ‘ডিজাস্টার ইন ডারউইন’ অর্থাৎ ‘ডারউইনে বিপর্যয়’। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকেরাও ম্যাচটির ফলকে অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান আরও কঠোর ভাষায় অস্ট্রেলিয়ার পরাজয়কে তুলে ধরেছে। তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জয়কে অস্ট্রেলিয়ার জন্য ‘হতাশাজনক ও অপমানজনক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্যামেরন গ্রিনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পরও বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে তাদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। মাত্র এক উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় সফরকারীরা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, ম্যাচের কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধিপত্য ধরে রাখায় জয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিবিসি স্পোর্টও বাংলাদেশের জয়কে টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে দেখেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়, র‍্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশ মাত্র কয়েকদিন আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল। এর আগে জুনে জিম্বাবুয়ের কাছেও হেরেছিল তারা। এমন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয় পাওয়াকে তাই আরও বেশি অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমের এমন প্রতিক্রিয়ার কারণও পরিষ্কার। নিজেদের মাটিতে বরাবরই দাপট দেখানো অস্ট্রেলিয়া এবার বাংলাদেশের বিপক্ষে কোনো পর্যায়েই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ২৮৪ রানের বেশি করতে পারেনি তারা। বিপরীতে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান তুলে ২২৮ রানের লিড নেয় এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে যায় ৯ উইকেট হাতে রেখেই।

হারের পর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি ম্যাচে ধীর ওভার রেটের কারণে আইসিসির কাছ থেকে বড় ধরনের আর্থিক শাস্তির মুখেও পড়তে পারে অস্ট্রেলিয়া, এমন খবরও দিয়েছে নিউজ কর্পের বিভিন্ন ওয়েবসাইট। সব মিলিয়ে অজি সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেও স্পষ্ট, ডারউইনের এই হার স্বাগতিকদের জন্য কতটা বড় ধাক্কা।প্রশংসায় সাবেক তারকারা

বাংলাদেশের এই জয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ভারতের রাজনীতিক ও ক্রিকেটপ্রেমী শশী থারুর এই জয়কে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের ‘গ্রেটেস্ট ভিক্টরি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল দৃঢ়, আবেগময় এবং শেষ পর্যন্ত জয় এনে দেওয়ার মতো।

ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্শা ভোগলে সরাসরি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দিন।’

পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামও বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে পেসার হাসান মাহমুদের বোলিং নজর কেড়েছে তার। আকরামের মতে, হাসান কোনো বাড়তি কিছু করার চেষ্টা না করে সঠিক টেস্ট লেংথে ধারাবাহিকভাবে বল করে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রেখেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ড্যামিয়েন ফ্লেমিংয়ের কাছেও এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তার মতে, ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও দক্ষতা, টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়। যা বাংলাদেশ দারুণভাবে দেখিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের জন্যও পরাজয়টি ছিল বড় ধাক্কা। অধিনায়ক হিসেবে ৩৯ টেস্টে এটি তার নবম হার। ঘরের মাঠে এর আগেও হারের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে এই পরাজয়কে আলাদা করে দেখতেই হচ্ছে। কারণ এবার শুধু ম্যাচের ফল নয়, পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণই অস্ট্রেলিয়ার হাতছাড়া হয়েছিল।

ক্রিকেট নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের জন্য পরিচিত আইসল্যান্ড ক্রিকেটও বাংলাদেশের জয় নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়েনি। ইংল্যান্ডকে খোঁচা দিয়ে তারা উল্লেখ করেছে, গত ১৫ বছরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ড যতগুলো টেস্ট জিতেছে, বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়ায় ঠিক ততগুলো টেস্ট জয় পেয়েছে।

তবে রসিকতার বাইরেও এই জয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মতো ঘরের মাঠে শক্তিশালী একটি দলের বিপক্ষে, নিজেদের আত্মবিশ্বাসও যখন খুব একটা উঁচুতে ছিল না, তখন বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের ওপর ভর করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। সব মিলিয়ে ডারউইনের জয় ছিল বাংলাদেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। ম্যাচ শেষে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের জয়টা প্রাপ্য ছিল।

বহুদিন ধরে প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশ কি নিজেদের চেনা কন্ডিশনের বাইরে বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষেও ধারাবাহিকভাবে লড়াই করতে পারে? ডারউইনে তার জোরালো উত্তর দিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

এলাকা ভিত্তিক সংবাদ